২২শে অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, শুক্রবার, সকাল ৭:০৫
নোটিশ :
Wellcome to our website...

শেষের কবিতা : অসমাপ্ত ভালোবাসা

রিপোর্টার / ১২৮২ বার
আপডেট : শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১, ০৭:০৫ পূর্বাহ্ন

সুইটি রাণি বনিক


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’- একটি অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প!
রংমাখা ফ্যাশন এর যে রুচিশীল ব্যক্তিত্ব মানুষকে এক্সটাগুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সমস্ত শেষের কবিতায় আমরা তাই দার্শনিক দৃষ্টি দান করি, মেনে নেয়া আর মনে নেয়ার মধ্যদিয়ে। শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্যে কিছু নতুনত্ব দেখা যায়। তার এ নতুনত্বের আরেক আনজাম শেষের কবিতা উপন্যাস। শেষের কবিতায় আধুনিক অভিজাত সমাজের মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের মেলবন্ধনের কথা এসেছে, এসেছে বিচ্ছেদ ও বিরহের কথা।
লেখার কলমের সঙ্গে চিত্রকল্পকে দেখার একধরনের গভীর অনুভূতি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতায় উপলব্ধি করা যায়। যেখানে একেকটা বক্তব্যের সঙ্গে আরেকটা বক্তব্যের বিষয়গুলো যেন বারবার কল্পনার চোখে দৃষ্টিত হয়। শেষ জীবনে এসে রবীন্দ্রনাথ দুজন মানব-মানবীর প্রেমের কাহিনি লিখলেন। তাও এ কোনো সরলরৈখিক প্রেম নয়, এ প্রেম চর্তুভুজাকৃতির। আর ব্যক্তিটি যখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তার জন্য এ আর এমন কী! তাই তো ১৯২৮ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছালেন তখনই তাঁর হাতে রচিত হলো কালজয়ী উপন্যাস, ‘শেষের কবিতা’। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে গত ৯০ বছরে একই জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক পাঠ্যবহুলতার মধ্যে রয়েছে। বাংলা সাহিত্যের খুব কম বই-ই এমন জনপ্রিয়তার কাতারে পৌঁছাতে পেরেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃষ্টি, শিল্প, কাব্যময়তায় এক ও অনন্য। শেষের কবিতায় তিনি যে ভাষার ব্যবহার ঘটিয়েছেন তা আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নতুন ধারারই উন্মোচক। 
২.
অমিত বলে, ফ্যাশানটা হল মুখোশ, স্টাইলটা হল মুখশ্রী। ওর মতে যারা সাহিত্যের ওমরাও দলের, যারা নিজের মন রেখে চলে, স্টাইল তাদেরই। আর যারা আমলা-দলের, দশের মন রাখা যাদের ব্যবসা, ফ্যাশান তাদেরই। বঙ্কিমি স্টাইল লেখা “বিষবৃক্ষে” বঙ্কিম তাতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন; বঙ্কিমি ফ্যাশান নসিরামের লেখা ‘‘মনোমোহনের মোহনবাগানে”, নসিরাম তাতে বঙ্কিমকে দিয়েছে মাটি করে। বারোয়ারি তাঁবুর কানাতের নীচে ব্যাবসাদার নাচওয়ালির দর্শন মেলে, কিন্তু শুভদৃষ্টিকালে বধূর মুখ দেখবার বেলার বেনারসি ওড়নার ঘোমটা চাই। কাতান হল ফ্যাশানের, আর বেনারসি হল স্টাইলের, বিশেষের মুখ বিশেষ রঙের ছায়ায় দেখবার জন্যে। অমিত বলে, হাটের লোকের পায়ে-চলা রাস্তার বাইরে আমাদের পা সরতে ভরসা পায় না বলেই আমাদের দেশে স্টাইলের এত অনাদর। দক্ষযজ্ঞের গল্পে এই কথাটির পৌরাণিক ব্যাখ্যা মেলে। ইন্দ্র চন্দ্র বরুণ একেবারে স্বর্গের ফ্যাশানদুরস্ত দেবতা, যাজ্ঞিকমহলে তাঁদের নিমন্ত্রণও জুটত। শিবের ছিল স্টাইল, এত ওরিজিন্যাল যে, মন্ত্রপড়া যজমানেরা তাঁকে হব্যকব্য দেওয়াটা বেস্তর বলে জানত। অক্সফোর্ডের বি এ’র এ-সব কথা শুনতে আমার ভালো লাগে। কেননা, আমার বিশ্বাস, আমার লেখার স্টাইল আছে– সেইজন্যেই আমার সকল বইয়েরই এক সংস্করণেই কৈবল্যপ্রাপ্তি, তারা “ন পুনরাবর্তনে-”।

আমার শ্যালক নবকৃষ্ণ অমিতর এ-সব কথা একেবারে সইতে পারত না- বলত, “রেখে দাও তোমার অক্সফোর্ডের পাস।” সে ছিল ইংরেজি সাহিত্যে রোমহর্ষক এম,এ ; তাকে পড়তে হয়েছে বিস্তর, বুঝতে হয়েছে অল্প। সেদিন সে আমাকে বললে, অমিত কেবলই ছোটো লেখককে বড়ো করে বড়ো লেখককে খাটো করবার জন্যেই। অবজ্ঞার ঢাক পিটোবার কাজে তার শখ, তোমাকে সে করেছে তার ঢাকের কাঠি।” দুঃখের বিষয়, এই আলোচনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন আমার স্ত্রী, স্বয়ং ওর সহোদরা। কিন্তু পরম সন্তোষের বিষয় এই যে, আমার শ্যালকের কথা তাঁর একটুও ভালো লাগে নি। দেখলুম, অমিতর সঙ্গেই তাঁর রুচির মিল, অথচ পড়াশুনো বেশি করেন নি। স্ত্রীলোকের আশ্চর্য স্বাভাবিক বুদ্ধি।

অমিতর নেশাই হল স্টাইলে। কেবল সাহিত্য-বাছাই কাজে নয়, বেশে ভূষার ব্যবহারে। ওর চেহারাতেই একটা বিশেষ ছাঁদ আছে। পাঁচজনের মধ্যে ও যে-কোনো একজন মাত্র নয়, ও হল একেবারে পঞ্চম। অন্যকে বাদ দিয়ে চোখে পড়ে। দাড়িগোঁফ- কামানো চাঁচা মাজা চিকন শ্যামবর্ন পরিপুষ্ট মুখ, স্ফূর্তি ভরা ভাবটা, চোখ চঞ্চল, হাসি চঞ্চল, নড়াচড়া চলাফেরা চঞ্চল, কথার জবাব দিতে একটুও দেরি হয় না; মনটা এমন এক রকমের চকমকি যে, ঠুন করে একটু ঠুকলেই স্ফুলিঙ্গ ছিটকে পড়ে। দেশী কাপড় প্রায়ই পরে, কেননা ওর দলের লোক সেটা পরে না। ধুতি সাদা থানের যত্নে কোঁচানো, কেননা ওর বয়সে এরকম ধুতি চলতি নয়। পাঞ্জাবি পরে, তরে বাঁ কাঁধ থেকে বোতাম ডানে দিকের কোমর অবধি, আস্তিনের সামনের দিকটা কনুই পর্যন্ত দু-ভাগ করা; কোমরে ধুতিটাকে ঘিরে একটা জরি-দেওয়া চওড়া খয়েরি রঙের ফিতে, তারাই বাঁ দিকে ঝুলছে বৃন্দাবনী ছিটের এক ছোটা থলি, তার মধ্যে ওর ট্যাঁকঘড়ি, পায়ে সাদা চামড়ার উপর লাল চামড়ার কাজ-করা কটকি জুতো। বাইরে যখন যায় একটা পাট-করা পাড়ওয়ালা মাদ্রাজি চাদর বাঁ কাঁধ থেকে হাঁটু অবধি ঝুলতে থাকে; বন্ধুমহলে যখন নিমন্ত্রণ থাকে মাথায় চড়ায় এক মুসলমানি লক্ষ্মৌ টুপি, সাদার উপর সাদা কাজ-করা। একে ঠিক সাজ বলব না, এ হচ্ছে ওর এক রকমের উচ্চ হাসি। ওর বিলিতি সাজের মর্ম আমি বুঝি নে, যারা বোঝে তারা বলে– কিছু আলুথালু গোছের বটে, কিন্তু ইংরেজিতে যাকে বলে ডিস্টিঙ্গুইশ্‌ড্‌। নিজেকে অপরূপ করবার শখ ওর নেই। কিন্তু ফ্যাশানকে বিদ্রূপ করবার কৌতুক ওর অপর্যাপ্ত। কোনামতে বয়স মিলিয়ে যারা কুষ্ঠির প্রমাণে যুবক তাদের দর্শন মেলে পথে ঘাটে; অমিতর দুর্লভ যুবকত্ব নির্জলা যৌবনের জোরেই, একেবারে বেহিসেবি, উড়নচন্ডী, বান ডেকে ছুটে চলেছে বাইরের দিকে, সমস্ত নিয়ে চলেছে ভাসিয়ে, হাতে কিছুই রাখে না। এ দিকে ওর দুই বোন, যাদের ডাকনাম সিসি এবং লিসি, যেন নতুন বাজারে অত্যন্ত হালের আমদানি– ফ্যাশানের পসরায় আপাদমস্তক যত্নে মোড়ক করা পয়লা নম্বরের প্যাকেট-বিশেষ। উচুঁ খুরওয়ালা জুতো, লেসওয়ালা বুক-কাটা জ্যাকেটের ফাঁকে অ্যাম্বারে মেশানো মালা, শাড়িটা গায়ে তির্যকভঙ্গিতে আঁট করে ল্যাপ্‌টানো। এরা খুট খুট করে দ্রুত লয়ে চলে; উচ্চ স্বরে বলে; স্তরে স্তরে তোলে সূক্ষাগ্র হাসি; মুখ ঈষৎ বেঁকিয়ে স্মিতহাস্যে উঁচু কটাক্ষে চায়, জানে কাকে বলে ভাবগর্ভ চাউনি; গোলাপি রেশমের পাখা ক্ষণে ক্ষণে গালের কাছে ফুর ফুর করে সঞ্চালন করে, এবং পুরুষবন্ধুর চৌকির হাতার উপরে বসে সেই পাখার আঘাতে তারে কৃত্রিম স্পর্ধার প্রতি কৃত্রিম তর্জন প্রকাশ করে থাকে।

আপন দলের মেয়েদের সঙ্গে অমিতর ব্যবহার দেখে তার দলের পুরুষদের মনে ঈর্ষার উদয় হয়। নির্বিশেষে ভাবে মেয়েদের প্রতি অমিতর ঔদাসীন নেই, বিশেষ ভাবে কারো প্রতি আসক্তিও দেখা যায় সম্বন্ধে ওর আগ্রহ নেই, উৎসাহ আছে। অমিত পার্টিতেও যায়, তাসও খেলে, ইচ্ছে করেই বাজিতে হারে, যে রমণীর গলা বেসুরা তাকে দ্বিতীয়বার গাইতে পীড়াপীড়ি করে, কাউকে বদ-রঙের কাপড় পরতে দেখলে জিজ্ঞাসা করে কাপড়টা কোন দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। যে-কোনো আলাপিতার সঙ্গেই কথা ব‘লে বিশেষ পক্ষপাতের সুর লাগায়; অথচ সবাই জানে, পক্ষপাতটা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়ালে সব দেবতাকেই সে সব দেবতার চেয়ে বড়ো বলে স্তব করে; দেবতাদের বুঝতে বাকি থাকে না, অথচ খুশিও হন। কন্যার মাতাদের আশা কিছুতেই কমে না, কিন্তু কন্যারা বুঝে নিয়েছে, অমিত সোনার রঙের দিগন্তরেখা, ধরা দিয়েই আছে তবু কিছুতেই ধরা দেবে না। মেয়েদের সম্বন্ধে ওর মন তর্কই করে, মীমাংসা আসে না। সেইজন্যেই গম্যবিহীন আলাপের পথে ওর এত দুঃসাহস। তাই অতি সহজেই সকলের সঙ্গে ও ভাব করতে পারে, নিকটে দাহ্যবস্তু’ থাকলেও ওর তরফে আগ্নেয়তা নিরাপদে সুরক্ষিত।

৩.

সেদিন পিকনিকে গঙ্গার ধারে যখন ওপারের ঘন কালো পুঞ্জীভূত স্তব্ধতার উপরে চাঁদ উঠল, অমিতর পাশে ছিল লিলি গাঙ্গুলি। তাকে ও মৃদুস্বরে বললে, “গঙ্গার ও পারে ঐ নতুন চাঁদ, আর এ পারে তুমি আর আমি, এমন সমাবেশটি অনন্তকালের মধ্যে কোনাদিনই আর হবে না”।

প্রথমটা লিলি গাঙ্গুলির মন এক মুহূর্তে ছল্‌ছলিয়ে উঠেছিল; কিন্তু সে জানত, এ কথাটায় যতখানি সত্য সে কেবল ঐ বলার কায়দাটুকুর মধ্যেই। তার বেশি দাবি করতে গেলে বুদবুদের উপরকার বর্নচ্ছটাকে দাবি করা হয়। তাই নিজেকে ক্ষণকালের ঘোর-লাগা থেকে ঠেলা দিয়ে লিলি হেসে উঠল, বললে, “অমিট, তুমি যা বললে সেটা এত বেশি সত্য যে, না বললেও চলত। এই মাত্র যে ব্যাঙটা টপ করে জলে লাফিয়ে পড়ল এটাও তো অনন্তকালের মধ্যে আর কোনাদিন ঘটবে না”। অমিত হেসে উঠে বললে, “তফাত আছে, একেবারে অসীম তফাত। আজকের সন্ধ্যাবেলায় ঐ ব্যাঙের লাফানোটা একটা খাপছাড়া ছেঁড়া জিনিস। কিন্তু তোমাতে আমাতে চাঁদেতে, গঙ্গার ধারায়, আকাশের তারায়, একটা সম্পূর্ণ ঐকতানিক সৃষ্টি–বেটোফেনের চন্দ্রালোক-গীতিকা। আমার মনে হয় যেন বিশ্বকর্মার কারখানায় একটা পাগলা স্বর্গীয় স্যাকরা আছে; সে যেমনি একটি নিখুঁত সুগোল সোনার চক্রে নীলার সঙ্গে হীরে এবং হীরের সঙ্গে পান্না লাগিয়ে এক প্রহরের আঙটি সম্পূর্ণ করলে আমনি দিলে সেটা সমুদ্রের জলে ফেলে, আর তাকে খুঁজে পাবে না কেউ”।

“ভালোই হল, তোমার ভাবনা রইল না, অমিট, বিশ্বকর্মার স্যাকরার বিল তোমাকে শুধতে হবে না”। “কিন্তু লিলি, কোটি কোটি যুগের পর যদি দৈবাৎ তোমাতে আমাতে মঙ্গলগ্রহের লাল অরণ্যের ছায়ায় তার কোনো-একটা হাজার-ক্রোশী খালের ধারে মুখোমুখি দেখা হয়, আর যদি শকুন্তলার সেই জেলেটা বোয়াল মাছের পেট চিরে আজকের এই অপরূপ সোনার মূহূর্তটিকে আমাদের সামনে এনে ধরে, চমকে উঠে মুখ-চাওয়া-চাউয়ি করব, তার পরে কী হবে ভেবে দেখো”। লিলি অমিতকে পাখার বাড়ি তাড়না করে বললে, “তার পরে সোনার মুহূর্তটি অন্যমনে খসে পড়বে সমুদ্রের জলে। আর তাকে পাওয়া যাবে না। পাগলা স্যাকরার গড়া এমন তোমার কত মুহূর্ত খসে পড়ে গেছে, ভুলে গেছ বলে তার হিসেব নেই”। এই বলে লিলি তাড়াতাড়ি উঠে তার সখীদের সঙ্গে গিয়ে যোগ দিলে। অনেক ঘটনার মধ্যে এই একটা ঘটনার নমুনা দেওয়া গেল।

অমিতর বোন সিসি-লিসিরা ওকে বলে, “অমি তুমি বিয়ে কর না কেন?” অমিত বলে, “বিয়ে ব্যাপারটায় সকলের চেয়ে জরুরি হচ্ছে পাত্রী, তার নীচেই পাত্র”। সিসি বলে, “অবাক করলে, মেয়ে এত আছে”। অমিত বলে, “মেয়ে বিয়ে করত সেই পুরাকালে লক্ষণ মিলিয়ে। আমি চাই পাত্রী আপন পরিচয়েই যার পরিচয়, জগতে যে অদ্বিতীয়।” সি সি বলে, “তোমার ঘরে এলেই তুমি হবে প্রথম, সে হবে দ্বিতীয়, তোমার পরিচয়েই হবে তার পরিচয়”। অমিত বলে, “আমি মনে মনে যে মেয়ের ব্যর্থ প্রত্যাশায় ঘটকালি করি সে গরঠিকানা মেয়ে। প্রায়ই সে ঘর পর্যন্ত এসে পৌঁছয় না। সে আকাশ থেকে পড়ন্ত তারা, হৃদয়ের বায়ুমণ্ডল ছুঁতে-না-ছুঁতেই জ্বলে ওঠে, বাতাসে যায় মিলিয়ে, বাস’রঘরের মাটি পর্যন্ত আসা ঘটেই ওঠে না।” সিসি বলে, “অর্থাৎ সে তোমার বোনেদের মতো একটুও না”। অমিত বলে, “অর্থাৎ, সে ঘরে এসে কেবল ঘরের লোকেরই সংখ্যা বৃদ্ধি করে না।” লিসি বলে, “আচ্ছা ভাই সিসি, বিমি বোস তো অমির জন্যে পথ চেয়ে তাকিয়ে আছে, ইশারা করলেই ছুটে এসে পড়ে, তাকে ওর পছন্দ নয় কেন? বলে, তার কালচার নেই। কেন ভাই, সে তো এম,এ-তে বটানিতে ফারস্ট্‌। বিদ্যেকেই তো বলে কালচার।” অমিত বলে, “কমল-হীরের পাথরটাকেই বলে বিদ্যে, আর ওর থেকে যে আলো ঠিকরে পড়ে তাকেই বলে কালচার। পাথরের ভার আছে, আলোর আছে দীপ্তি।” লিসি রেগে উঠে বলে, “ইস, বিমি বোসের আদর নেই ওর কাছে! উনি নিজেই নাকি তার যোগ্য! অমি যদি বিমি বোসকে বিয়ে করতে পাগল হয়েও ওঠে আমি তাকে সাবধান করে দেব, সে যেন ওর দিকে ফিরেও না তাকায়।” অমিত বললে, “পাগল না হলে বিমি বোসকে বিয়ে করতে চাইবই বা কেন? সে সময়ে আমার বিয়ের কথা না ভেবে উপযু্‌ক্ত চিকিৎসার কথা ভেবো।”

আত্নীয়স্বজন অমিতর বিয়ের আশা ছেড়েই দিয়েছে। তারা ঠিক করেছে, বিয়ের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা ওর নেই, তাই ও কেবল অসম্ভবের স্বপ্ন দেখে আর উলটো কথা বলে মানুষকে চমক লাগিয়ে বেড়ায়। ওর মনটা আলেয়ার আলো, মাঠে বাটে ধাঁধা লাগাতেই আছে, ঘরের মধ্যে তাকে ধরে আনবার জো নেই। ইতোমধ্যে অমিত যেখানে সেখানে হো হো করে বেড়াচ্ছে- ফিরপোর দোকানে যাকে তাকে চা খাওয়াচ্ছে; যখন তখন মোটরে চড়িয়ে বন্ধুদের অনাবশ্যক ঘুরিয়ে নিয়ে আসছে; এখান ওখান থেকে যা তা কিনছে আর একে ওকে বিলিয়ে দিচ্ছে; ইংরেজি বই সদ্য কিনে এ বাড়িতে ও বাড়িতে ফেলে আসছে, আর ফিরিয়ে আনছে না। ওর বোনেরা ওর যে অভ্যাসটা নিয়ে ভারি বিরক্ত সে হচ্ছে ওর উলটো কথা বলা। সজ্জনসভায় যা-কিছু সর্বজনের অনুমোদিত ও তার বিপরীত কিছু-একটা বলে বসবেই।

একদা কোন-একজন রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ডিমোক্রাসির গুণ বর্ণনা করছিল; ও বলে উঠল, ‘বিষ্ণু যখন সতীর মৃতদের খণ্ড খণ্ড করলেন তখন দেশ জুড়ে যেখানে সেখানে তাঁর একশোর অধিক পীঠস্থান তৈরি হয়ে গেল। ডিমোক্রসি আজ যেখানে সেখানে যত টুকরো অ্যারিস্টক্রেসির পুজো বসিয়েছে- খুদে খুদে অ্যারিষ্টক্রাটে পৃথিবী ছেয়ে গেল, কেউ পলিটিক্সে, কেউ সাহিত্যে, কেউ সমাজে। তাদের কারো গাম্ভীর্য নেই, কেননা তাদের নিজের পরে বিশ্বাস নেই।’

একদা মেয়েদের পরে পুরুষের আধিপত্যের অত্যাচার নিয়ে কোনো সমাজহিতৈষী অবলাবান্ধব নিন্দা করছিল পুরুষদের। অমিত মুখ থেকে সিগারেটা নামিয়ে ফস্‌ করে বললে, পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর।’ সভার অবলা ও অন্বান্ধবেরা চটে উঠে বললে, ‘মানে কী হল’? অমিত বললে, ‘যে পক্ষের দখলে শিকল দিয়েই পাখিকে বাঁধে, অর্থাৎ জোর দিয়ে। শিকল নেই যার সে বাঁধে আফিম খাইয়ে, অর্থাৎ মায়া দিয়ে। শিকলওয়ালা বাঁধা বটে কিন্তু ভোলায় না, আফিমওয়ালী বাঁধেও বটে ভোলায়ও। মেয়েদের কৌটো আফিমে ভরা, প্রকৃতি-শয়তানী তার জোগান দেয়।’ একদিন এওদর বালিগঞ্জের এক সাহিত্যসভায় রবি ঠাকুরের কবিতা ছিল আলোচনার বিষয়। অমিত জীবনে এই সে প্রথম সভাপতি হতে রাজি হয়েছিল; গিয়েছিল মনে মনে যুদ্ধসাজ পরে। একজন সেকেলে গোছের অতি ভালোমানুষ ছিল বক্তা। রবি ঠাকুরের কবিতা যে কবিতাই এইটে প্রমাণ করাই তার উদ্দেশ্য। দুই-একজন কলেজের অধ্যাপক ছাড়া অধিকাংশ সভ্যই স্বীকার করলে, প্রমাণটা একরকম সন্তোষজনক।

সভাপতি উঠে বললে, ‘কবিমাত্রের উচিত পঁচিশ থেকে ত্রিশ পর্যন্ত। এ কথা বলব না যে পরবর্তীদের কাছ থেকে আরো ভালো কিছু চাই, বলব অন্য কিছু চাই। ফজলি আম ফুরালে বলব না, আনো ফজরিতর আম; বলব, নতুন বাজার থেকে বড়ো দেখে আতা নিয়ে এসো তো হে। ডাব-নারকেলের মেয়াদ অল্প, সে রসের মেয়াদ; ঝুনো নারকেলের মেয়াদ বেশি; সে শাঁসের মেয়াদ। কবিরা হল ক্ষণজীবী, ফিলজফরের বয়সের গাছপাথর নেই।… রবি ঠাকুরের বিরুদ্ধে সব চেয়ে বড়ো নালিশ এই যে,বুড়ো ওয়ার্ডসওয়ার্থের নকল করে ভদ্রলোক অতি অন্যায়রকম বেঁচে আছে। যম বাতি নিবিয়ে দেবার জন্যে থেকে থেকে ফরাশ পাঠায়, তবু লোকটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চৌকির হাতা আঁকড়িয়ে থাকে। ও যদি মানে মানে নিজেই সরে না পড়ে, আমাদের কর্তব্য ওর সভা ছেড়ে দল বেঁধে উঠে আসা। পরবর্তী যিনি আসবেন তিনিও তাল ঠুকেই গর্জাতে গর্জাতে আসবেন যে, তাঁর রাজত্বের অবসান নেই, অমরাবর্তী বাঁধা থাকবে মর্তে তাঁরই দরজায়। কিছুকাল ভক্তরা দেবে মাল্যচন্দন, খাওয়াবে পেট ভরিয়ে, সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করবে, তার পরে আসবে তাঁকে বলি দেবার পুণ্যদিন-ভক্তিবন্ধন থেকে ভক্তদের পরিত্রাণের শুভলগ্ন। আফ্রিকার চতুষ্পদ দেবতার পুজোর প্রণালী এই রকমই। দ্বিপদী ত্রিপদী চতুষ্পদী চতুর্দশপদী দেবতাদের পুজোও এই নিয়মে। পূজা জিনিসটাকে একঘেয়ে করে তোলার মতো অপবিত্র অধার্মিকতা আর- কিছু হতে পারে না। … ভালো-লাগার এভোল্যুশন আছে। পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি এই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে। একটু ঠেলা মারলেই তার নিজের কাছে প্রমাণ হবে যে, সেন্টিমেন্টাল আত্মীয়েরা তার অন্ত্যেষ্টি- সৎকার করতে বিলম্ব করেছিল, বোধ করি উপযুক্ত উত্তরাধিকারীকে চিরকাল ফাঁকি দেবার মতলবে। রবি ঠাকুরের দলের এই অবৈধ ষড়যন্ত্র আমি পাবলিকের কাছে প্রকাশ করব বলে প্রতিজ্ঞা করেছি।’

আমাদের মণিভূষণ চশমার ঝলক লাগিয়ে প্রশ্ন করলে, ‘সাহিত্যে থেকে লয়ালটি উঠিয়ে দিতে চান?’ ‘একেবারেই। এখন থেকে কবি প্রেসিডেন্টের দ্রুত-নিঃশেষিত যুগ। রবি ঠাকুর সম্বন্ধে আমার দ্বিতীয় বক্তব্য এই যে, তাঁর রচনারেখা তাঁরই হাতের অক্ষরের মতো-গোল বা তরঙ্গরেখা, গোলাপ বা নারীর মুখ বা চাঁদের ধরনে। ওটা প্রিমিটিভ; প্রকৃতির হাতের অক্ষরের মক্‌শো-করা। নতুন প্রেসিডেন্টের কাছে চাই কড়া লাইনের, খাড়া লাইনের রচনা-তীরের মতো, বর্শার ফলার মতো, কাঁটার মতো; ফুলের মতো নয়; বিদ্যুতের রেখার মতো, ন্যুরাল্‌জিয়ার ব্যথার মতো- খোঁচাওয়ালা, কোণওয়ালা, গথিক গির্জের ছাঁদে; মন্দিরের মণ্ডপের ছাঁদে নয়; এমন কি, যদি চটকল পাটকল অথবা সেক্রেটারিয়েট- বিল্‌ডিঙের আদলে হয়, ক্ষতি নেই।… এখন থেকে ফেলে দাও মন ভোলাবার ছলাকলা ছন্দোবন্ধ, মন কেড়ে নিতে হবে যেমন রাবণ সীতাকে কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল। মন যদি কাঁদতে কাঁদতে আপত্তি করতে করতে যায় তবুও তাকে যেতেই হবে- অতিবৃদ্ধ জটায়ুটা বারণ করতে আসবে, তাই করতে গিয়েই তার হবে মরণ। তার পরে কিছুদিন যেতেই কিস্কিন্ধ্যা জেগে উঠবে, কোন হনুমান হঠাৎ লাফিয়ে পড়ে লঙ্কায় আগুন লাগিয়ে মনটাকে পূর্বস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে আসবার ব্যবসা করবে। তখন আবার হবে টেনিসনের সঙ্গে পুনর্মিলন, বায়রনের গলা জড়িয়ে করব অশ্রুবর্ষণ, ডিকেনসকে বলব, মাপ করো, মোহ থেকে আরোগ্যলাভের জন্যে তোমাকে গাল দিয়েছি।…. মোগল বাদশাদের কাল থেকে আজ পর্যন্ত দেশের যত মুগ্ধ মিস্ত্রি মিলে যদি যেখানে সেখানে ভারত জুড়ে কেবলই গম্বুজওয়ালা পাথরের বুদ্‌বুদ্‌ বানিয়ে চলত তা হলে ভদ্রলোক মাত্রই যেদিন বিশ বছর বয়স পেরোত সেইদিনই বানপ্রস্ত’ নিতে দেরি করত না। তাজমহলকে ভালো লাগাবার জন্যেই তাজমহালে নেশা ছুটিয়ে দেওয়া দরকার।

৪.

বর্তমানে আমরা ফ্যাশন ও স্টাইল সম্পর্কে নতুনভাবে জানছি ও জানাচ্ছি কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ৯০ বছর আগেই সেসব ব্যবহার করেছেন শেষের কবিতায়। আবার বলেছেন, ‘লোকে ভুলে যায় দাম্পত্যটা একটা আর্ট- প্রতিদিন তাকে নতুন করে সৃষ্টি করা চাই।’ দাম্পত্যকে আর্টের সঙ্গে তুলনা করে দাম্পত্যের সম্পর্ককে আরও বেশি গতিময় করেছেন। প্রমিত বাংলা ভাষায় রচিত চমৎকার বাক্যাবলির সুসংমিশ্রণ শব্দের আদলে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ উপন্যাসটি লিখেছেন। যেখানে প্রেম আছে, বিরহ আছে, বিচ্ছেদ আছে, কাব্যিক ছন্দময়তা আছে, হাস্যরস আছে। অমিতের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ শেষের কবিতায় আমরা যেন জীবন্ত রবীন্দ্রনাথকেই দেখতে পাই। শেষের কবিতার ভাষাগত শৈলী অপূর্ব। যেন এক শব্দের পর আরেক শব্দ শোনার অপেক্ষা। গদ্য সাহিত্যের মধ্যেও যে ছন্দময়তা থাকতে পারে, তা শেষের কবিতার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হয়।  অমিত উপন্যাসের নায়ক। অমিতের এই চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ শৈল্পিক বিমূর্ততায় সাজিয়েছেন। বলতে গেলে সম্পূর্ণ উপন্যাসটিকে সে একাই টেনেছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘যে মানুষ অনেক দেবতার পূজারি, আড়ালে সব দেবতাকেই সে সব দেবতার চেয়ে বড়ো ব’লে স্তব করে; দেবতাদের বুঝতেও বাকি থাকে না অথচ খুশিও হন। কন্যার মাতাদের আশা কিছুতেই কমে না, কিন্তু কন্যারা বুঝে নিয়েছে অমিত সোনার রঙের দিগন্ত রেখা- ধরা দিয়েই আছে তবু কিছুতেই ধরা দেবে না। মেয়েদের সম্বন্ধে ওর মন তর্কই করে, মীমাংসায় আসে না। সেই জন্যই গম্যবিহীন আলাপের পথে ওর এত দুঃসাহস। তাই অতি সহজেই সকলের সঙ্গে ও ভাব করতে পারে- নিকটে দাহ্যবস্তু থাকলেও ওর তরফে আগ্নেয়তা নিরাপদে সুরক্ষিত।’ 

অমিতের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ভাষাকে আরও বেশি দৃঢ়তা দান করেছেন। যেখানে অমিত ছন্নছাড়া এবং কারও যুক্তিকে সে তোয়াক্কা করে না। সে নানান যুক্তির মধ্য দিয়ে তার কথাকে প্রতিষ্ঠিত করে। যেমন, তাজমহলের পুনরাবৃত্তির প্রসঙ্গে রবি ঠাকুরের ভক্ত আরক্তমুখে বলে উঠল, ‘ভাল জিনিস যত বেশি হয় ততই ভালো।’ কিন্তু অমিত বলল তার ঠিক উল্টোটা, ‘বিধাতার রাজ্যে ভাল জিনিস অল্প হয় বলেই তা ভালো, নইলে সে নিজেরই ভিড়ের ঠেলায় হয়ে যেত মাঝারি।’ শিলঙ পাহাড়ে অমিত ও লাবণ্য যখন একসঙ্গে ঘুরতে গেলো তখন অমিত লাবণ্যকে একটা ছ্যাৎলা পড়া পাথরের মধ্যে বসতে অনুরোধ করলে লাবণ্য ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু সময় যে অল্প।’ অমিত বলল, ‘জীবনে সেটাই তো শোচনীয় সমস্যা লাবণ্যদেবী, সময় অল্প।… সময় যাদের বিস্তর তাদের পাঙ্কচুয়াল হওয়া শোভা পায়। দেবতার হাতে সময় অসীম; তাই ঠিক সময়টিতে সূর্য ওঠে, ঠিক সময়ে অস্ত যায়। আমাদের মেয়াদ অল্প, পাঙ্কচুয়াল হতে গিয়ে সময় নষ্ট করা আমাদের পক্ষে অমিতব্যয়িতা।’

শেষের কবিতা উপন্যাসে চতুর্ভুজ প্রেম নির্ভরতার প্রয়াস পাওয়া যায়। যেমন- অমিতর সঙ্গে কেতকীর, লাবণ্যের সঙ্গে অমিতর, আবার শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যের। দ্বৈত প্রেমের আবেশে নিবিষ্ট উপন্যাসটি। যার প্রমাণ মেলে অমিতের একটি উক্তির মধ্য দিয়ে, ‘কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালবাসারই। কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল, প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের ভালবাসা, সে রইল দীঘি। সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।’ অথবা, ‘যে ভালবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে থাকে অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সব-কিছুতেই যুক্ত হয়ে থাকে সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।’

লাবণ্যকে না পাওয়ার পেছনে অমিতের কিছু হালছাড়া স্বভাব প্রকাশ পেয়েছে। অমিতর ওয়েস্টার্ন মাইন্ডের একটা প্রভাব আমরা এখানে লক্ষ্য করি; যে কিনা তার ক্লাসমেট কেতকীকে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় ভালবেসেছিল। আংটিও পরিয়ে ছিলো। কিন্তু সাত বছর পর, কেতকী যখন দেশে ফিরে অমিতকে চায়, তখন সে কেতকীকে ফেরাতে পারে না। অথচ সাত বছরের আগের প্রেমকে সে চাইলেই এড়িয়ে যেতে পারতো কিন্তু সে তা না করে লাবণ্যের কাছ থেকে দূরে সরে গেলো। অথচ উপন্যাসের শুরুর দিকে, বালিগঞ্জের সাহিত্য সভায় অমিত বলেছিল, ‘পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে।’ এই বাক্যের সাথে অমিতের বাস্তবতার কোনো মিল নেই। যেন মনে হচ্ছে অমিত একটা ছদ্মবেশ; যে চেয়েছিল আত্মপ্রতিষ্ঠা ও খ্যাতি। অথবা অমিত সম্পর্কে বলতে  গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথমেই বলেছেন, ‘মেয়েদের সম্বন্ধে ওর আগ্রহ নেই, উৎসাহ আছে।’ হয়তো সেই উৎসাহই তাকে ভালবাসতে সাহায্য করেছে কিন্তু সে জন্যই সম্পর্কটা ঘর বাঁধা পর্যন্ত গড়ায়নি। সম্পর্কের এক পর্যায়ে এসে লাবণ্য বুঝতে পেরেছিল, অমিতকে সে হয়তো জীবনে আর পাবে না। তাই তো সে বলেছিল, ‘তুমি আমার যত কাছেই থাক তবু আমার থেকে তুমি অনেক দূরে।’ মুক্তি পর্বে অমিত লাবণ্যকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে কিন্তু লাবণ্যের মনে তেমন কোনো সাড়া নেই। অমিত নানাভাবে ওকে আগলে রাখছে কিন্তু লাবণ্য যেন শান্ত ও নিবিড়। কেতকীর হাত থেকে আংটি খুলে অমিত একদিন লাবণ্যকে পরিয়েছিল আজ লাবণ্য সে আংটি খুলে আমিতের আঙুলে আস্তে করে পরিয়ে দিলো। আর বললো, ‘আমাকে তুমি কোন আংটি দিয়ো না।  কোন চিহ্ন রাখবার কিছু দরকার নেই। আমার প্রেম থাক নিরঞ্জন। বাইরের রেখা- বাইরের ছায়া তাতে পড়বে না।’ তাতে অমিতও কোনো বাধা দিলো না।

কেতকীর সম্পর্কে বলতে গিয়ে লাবণ্য বললো, ‘অন্তত হপ্তাখানেকের জন্য তোমার দলকে নিয়ে তুমি চেরাপুঞ্জিতে বেড়িয়ে এসো। ওকে (কেতকি) আনন্দ দিতে নাও যদি পারো, ওকে আমোদ দিতে পারবে।’ অমিত রাজি হলো। কিন্তু সাতদিন পর অমিত চেরাপুঞ্জি থেকে ফিরে যোগমায়ার বাসায় গেলো। কিন্তু ঘর বন্ধ, সবাই চলে গেছে। কোথায় গেছে তার কোনো ঠিকানা রেখে যায়নি। লেখকের ভাষায়, ‘সমস্ত শিলঙ পাহাড়ের শ্রী আজ চলে গেছে।’ যেন লাবণ্যই ছিল সব সৌন্দর্যের আধার।

৫.

শেষের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের বিশেষ কিছু লাইন আছে যা হৃদয়কে বড় স্পর্শ করে। যেমন- পুরুষ আধিপত্য ছেড়ে দিলেই মেয়ে আধিপত্য শুরু করবে। দুর্বলের আধিপত্য অতি ভয়ংকর। যে পক্ষের দখলে শিকল আছে সে শিকল দিয়েই পাখিকে বাঁধে, অর্থাৎ জোর দিয়ে। শিকল নেই যার সে বাঁধে আফিম খাইয়ে, অর্থাৎ মায়া দিয়ে। শিকলওয়ালা বাঁধে বটে কিন্তু ভোলায় না, আফিমওয়ালী বাঁধেও বটে ভোলাও। মেয়েদের কৌটো আফিমে ভরা, প্রকৃতি – শয়তানী তার জোগান দেয়। পৃথিবীতে হয়তো দেখবার যোগ্য লোক পাওয়া যায়, তাকে দেখবার যোগ্য জায়গাটি পাওয়া যায় না।  মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়া, এই দুইয়ের তফাৎ আছে। 
ওর যেটাতে আপত্তি নেই সেটাতে আর কারো আপত্তি থাকতে পারে, অমিত সেই আশঙ্কাটাকে একেবারে উড়িয়ে দিয়ে কথাবার্তা কয়। সেই জন্য তার প্রস্তাবে আপত্তি করা শক্ত। যা আমার ভাল লাগে তাই আর একজনের ভাল লাগে না, এই নিয়েই পৃথিবীতে যত রক্তপাত।  নাম যার বড় তার সংসারটা ঘরে অল্প, বাইরেই বেশি… নামজাদা মানুষের বিবাহ স্বল্প বিবাহ, বহুবিবাহের মতোই গর্হিত। যে রত্নকে সস্তায় পাওয়া গেল তারও আসল মূল্য যে বোঝে সেই জানব জহুরি। পড়ার সময় যারা ছুটি নিতে জানে না তারা পড়ে, পড়া হজম করে না। যে ছুটি নিয়মিত, তাকে ভোগ করা আর বাধা পশুকে শিকার করা একই কথা। ওতে ছুটির রস ফিকে হয়ে যায়।
পুরুষ তার সমস্ত শক্তিকে সার্থক করে সৃষ্টি করতে, সেই সৃষ্টি আপনাকে এগিয়ে দেবার জন্যই আপনাকে পদে পদে ভোলে। মেয়ে তার সমস্ত শক্তিকে খাটায় রক্ষা করতে, পুরোনোকে রক্ষা করবার জন্যেই নতুন সৃষ্টিকে সে বাধা দেয়। রক্ষার প্রতি সৃষ্টি নিষ্ঠুর, সৃষ্টির প্রতি রক্ষা বিঘ্ন …এক জায়গায় এরা পরস্পরকে আঘাত করবেই। যেখানে খুব মিল সেখানেই মস্ত বিরুদ্ধতা …আমাদের সকলের চেয়ে বড়ো যে পাওনা সে মিলন নয়, সে মুক্তি।
ভালোবাসায় ট্রাজেডি সেখানেই ঘটে যেখানে পরস্পরকে স্বতন্ত্র জেনে মানুষ সন্তুষ্ট থাকতে পারে নি – নিজের ইচ্ছা অন্যের ইচ্ছে করবার জন্যে যেখানে জুলুম – যেখানে মনের করি, আপন মনের মত করে বদলিয়ে অন্যকে সৃষ্টি করে। বিয়ের ফাঁদের জড়িয়ে পড়ে স্ত্রী-পুরুষ যে বড়ো বেশি কাছাকাছি এসে পড়ে, মাঝে ফাঁক থাকে না; তখন একেবারে গোটা মানুষকে নিয়ে কারবার করতে হয় নিতান্ত নিকটে থেকে। কোন একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকে না। মানুষের মৃত্যুর পরে তার জীবনী লেখা হয় তার কারণ, একদিকে সংসারে সে মরে, আর–এক দিকে মানুষের মনে সে নিবিড় করে বেঁচে ওঠে।  মানুষের কোনো কথাটাই সোজা নয়। আমরা ডিক্‌শনারিতে যে কথার এক মানে বেঁধে দেই, মানব-জীবনের মধ্যে মানেটা সাতখানা হয়ে যায়; সমুদ্রের কাছে এসে গঙ্গার মতো!  বিবাহের হাজারখানা মানে। মানুষের সঙ্গে মিশে তার মানে হয়, মানুষকে বাদ দিয়ে তার মানে বের করতে গেলেই ধাঁ ধাঁ লাগে। সহজকে সহজ রাখতে হলে শক্ত হতে হয়।  মেয়েদের ভালো-লাগা তার আদরের জিনিসকে আপন-অন্দর মহলে একলা নিজেরই করে রাখে, ভিড়ের লোকের কোন খবরই রাখে না। সে যত দাম দিতে পারে সব দিয়ে ফেলে, অন্য পাঁচজনের সঙ্গে মিলিয়ে বাজার যাচাই করতে তার মন নেই। 

৬.

অমিতের কাছে লাবণ্যের ব্যক্তিত্ব কবি ফুটিয়ে তুলেছেন, এমন অসাধারণ ভাবে যা পাঠককে মুগ্ধ করে। অমিত অনেক সুন্দরী মেয়ে দেখেছে, তাদের সৌন্দর্য পূর্ণিমা-রাত্রির মতো, উজ্জ্বল অথচ আচ্ছন্ন; লাবণ্যর সৌন্দর্য সকাল-বেলার মতো, তাতে অস্পষ্টতার মোহ নেই, তার সমস্তটা বুদ্ধিতে পরিব্যাপ্ত। তাকে মেয়ে করে গড়বার সময় বিধাতা তার মধ্যে পুরুষের একটা ভাগ মিশিয়ে দিয়েছেন; তাকে দেখলেই বোঝা যায়, তার মধ্যে কেবল বেদনার শক্তি নয়, সেই সঙ্গে আছে মননের শক্তি। এইটেতেই অমিতকে এত করে আকর্ষণ করেছে। অমিতের নিজের মধ্যে বুদ্ধি আছে, ক্ষমা নেই, বিচার আছে ধৈর্য নেই; ও অনেক জেনেছে, শিখেছে, কিন্তু শান্তি পায় নি। লাবণ্যর মুখে ও এমন একটি শান্তির রূপ দেখেছিল যে শান্তি হৃদয়ের তৃপ্তি থেকে নয়, যা ওর বিবেচনাশক্তির গভীরতায় অচঞ্চল।
অন্যদিকে, লাবণ্যের বাল্যবন্ধু শোভনলাল লাবণ্যকে চিঠি দিয়ে জানাল সে, শিলঙে এসেছে। লাবণ্যও চিঠির প্রত্যুত্তর দিলো। এবং শেষ পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক ঠেকলো বিয়ের পিঁড়ি পর্যন্ত। অতঃপর যতিশংকর লাবণ্যের লেখা একটি চিঠি এনে অমিতের হাতে দিলো। এর এক পৃষ্ঠায় ছিলো লাবণ্য ও শোভনলালের বিয়ের খবর অন্য পৃষ্ঠায় একটি সুদীর্ঘ কবিতা এবং সেটাই হলো শেষের কবিতা। যতিশংকরের হাত থেকে লাবণ্যের চিঠি পাওয়ার পরও অমিতের মধ্যে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। যেখানে শোভনলালের সঙ্গে ছয় মাস পরে লাবণ্যের বিয়ের দিন ধায্য হয়েছে। শেষের কবিতার শেষে লাবণ্য লিখছে, ‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান/গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/হে বন্ধু, বিদায়।’
অমিতের ভালবাসার সব দানকে লাবণ্য অকপটে স্বীকার করে নিলো। ভালবাসার দায় যে মানুষকে ঋণী করে সে কথাই যেন এই লাইনের মাধ্যমে লাবণ্য জানান দিলো। অমিতের কথায়, ‘মন যখন খুব বড়ো হয়ে ওঠে তখন মানুষ যুদ্ধও করে, ক্ষমাও করে।’ লাবণ্য যুদ্ধ করে অমিতের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে আর আজ যখন মন খুব উদার তখন অকপটে সব কিছু স্বীকার করে নিলো অর্থাৎ ক্ষমা করে দিলো।

রবীন্দ্রনাথ, ‘মানসী’তে বলেছিলেন, ‘মিলনে প্রেম ম্লান হয়।’ হয়তো তিনি প্রেমকে ম্লান করতে চাননি বলেই অমিত ও লাবণ্যের প্রেমকে বিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে অম্লান করে রেখেছেন। শেষের কবিতা উপন্যাসের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তার যৌবনকালের ব্যক্তিমানসের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা, দর্শন ও তার রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সমস্ত উপন্যাসজুড়েই নানা আদলে জীবন্ত রবীন্দ্রনাথই যেন আমাদের কাছে ধরা দেন।
সাহিত্যের সমঝদার অমিত ও লাবণ্য দুজনেই। দুজনের বেড়ে ওঠার ধরন ভিন্ন, জীবন ও যাপনে রয়েছে বৈপরীত্য। তবু একে অপরের মধ্যে যেন নিজের পরিপূরক রূপ খুঁজে পায় তারা। অমিত কলকাতার উচ্চবিত্ত সমাজের তরুণীদের হৃদয়ে মুহূর্তেই আলোড়ন জাগানো এক যুবাপুরুষ।
চারদিকে শুধু ফ্যাশনেরই ছড়াছড়ি। চাইতে না চাইতে অমিতও সেই ফ্যাশনের অন্তর্গত দলের সদস্য। কিন্তু লেখক অমিতের মনের চাওয়াটা বুঝতে পেরে বলেছেন, “অমিতের নেশাই হলো স্টাইলে”। তাই সে ফ্যাশনের সঙ্গ উপভোগ করলেও শেষমেশ স্টাইলের কাছেই আশ্রয় খুঁজতে চাইবে, এ আর আশ্চর্য কি! ভালবাসা যেন বিরামহীন এক কবিতা। ভালবাসা এক কেন একাধিক মানুষেও আবদ্ধ না হতেও পারে। ভালবাসার বিরামহীন সুর ‘তাকে’ ডাকতেই থাকে। শেষের কবিতা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ দেখালেন সেই বিরামহীন সুরটাকেই কাব্যিক সুরে বেঁধে। এই সুরের অন্যদিকে থাকে সীমাহীন বিস্তৃত প্রেম, নিজেকেই যাতে হারিয়ে ফেলা যায়। এ প্রেমের তল পাওয়া যায় না, আকণ্ঠ নিমজ্জনে তাতে শুধু সাঁতরে বেড়ানো যায়।
আমরা শেষের কবিতা উপন্যাসে পরিষ্কার ভাবে দুটি দিক দেখতে পাই। একদিকে নাক উঁচু সমাজের নায়ক অমিত (অমিট) সাদাটাকে কালো প্রমাণ করতে পারলেই যেন অগাধ শান্তি পায়। অন্যদিকে দেখতে পাই শিলং এর প্রকৃতি হৃদয়ে আগলে প্রকৃতিকন্যা হয়েই ধরা দিয়েছে লাবণ্য!

৭.

শেষের কবিতা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ পুনঃ রবীন্দ্রযুগ প্রতিষ্ঠা করেছেন। যদিও রবীন্দ্রনাথের নতুন করে কিছুই প্রমাণ করার ছিল না। তবুও হঠাৎ হাওয়ায় ডানা পেয়ে যাওয়া সেই সব কবি সাহিত্যিকদের রবীন্দ্রনাথ একটা জবাব দিয়েছেন শেষের কবিতায়। যোগাযোগ উপন্যাসের পর রবীন্দ্রনাথের এভাবে লাবণ্য অমিতের রোমান্স নিয়ে ফিরে আসা হতবাক করার মতোই। রবীন্দ্রনাথ দেখিয়ে দিলেন উনি চির আধুনিক। চির প্রাসঙ্গিক।
অমিত রবীন্দ্রনাথের এক ডোরাকাটা সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথ এমন চরিত্র খুব বেশি আঁকেন নি। অমিত সব কিছুকে তুছ্য-তাছিল্য করে সোজাটাকে বাঁকা বানিয়ে নিজেকে সবার থেকে আলাদা করে তুলে ধরতে চায়। যদিও এমন চাওয়া সবার ভেতরই কমবেশি থাকে কিন্তু পাঁচজনের ভিড় থেকে সবাই নিজেকে আলাদা ভাবে তুলে ধরতে পারে না। অমিত পেরেছে। ও নিজেকে সাধারণ বলে শুধু নিজের অসাধারণতা দেখানোর জন্যই। লেখক সেই সময়ের নারী চরিত্র আঁকতে গিয়ে যে কয়েকটি লাইন লিখেছেন তাতেই সব আয়নার মতো স্বচ্ছ হয়ে যায়। “এরা খুট খুট করে দ্রুত লয়ে চলে; উচ্চৈঃস্বরে বলে; স্তরে স্তরে তোলে সূক্ষ্মাগ্র হাসি; মুখ ঈষৎ বেঁকিয়ে স্মিতহাস্যে উঁচু কটাক্ষে চায়, জানে কাকে বলে ভাবগর্ভ চাউনি; গোলাপি রেশমের পাখা ক্ষণে ক্ষণে গালের কাছে ফুর ফুর করে সঞ্চালন করে, এবং পুরুষবন্ধুর চৌকির হাতার উপরে বসে সেই পাখার আঘাতে তাদের কৃত্রিম স্পর্ধার প্রতি কৃত্রিম তর্জন প্রকাশ করে থাকে।’ কেমন ছিলেন সেই সময়ের শিক্ষিত মহিলারা। কেমন ছিল তাদের চালচলন সব এখানে স্বচ্ছ। পাশ্চাত্যের পালিশ লেগে যাওয়া অচরণের ছাপ এখানে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন রবীন্দ্রনাথ। উপন্যাস গড়িয়ে গেছে জীবনের নানা রঙের স্বপ্ন আর কবিতায়। কিন্তু উপন্যাসের গতি হঠাৎ করেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে কেতকীর আগমনে। কেতকী পুরো উপন্যাসটার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পাঠক হাহাকার করে বলে উঠে “একি করলেন, ‘ঠাকুর’ একি করলেন!” আসলে অমিত লাবণ্যের মিলনের জন্য যখন উপন্যাস প্রস্তুত, পাঠক মন চঞ্চল ঠিক তখনই রবির গোধূলি মাখা বিরাগ সুর জড়িয়ে ধরেছে উপন্যাসটিকে। কিছুতেই মিলন হতে দেবো না এই ছিল কলমের দাবি। রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ উপমায় লাবণ্যের প্রেমকে দিঘি বানিয়ে কেতকীকে ডুবিয়ে দিলেন। কেতকি হয়ে রইল সামান্য জলের ঘড়া। রবি ঠাকুর এখানে অমিতকে দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করালেন ঠিকই কিন্তু পাঠক উপন্যাস শেষের অতিনাটকীয়তা মেনে নিতে পারল না। আমরা পরবর্তীকালে বুদ্ধদেব গুহর ‘একটু উষ্ণতার জন্য’ উপন্যাসেও একই সমস্যা দেখি। এর পরেও শেষের কবিতা আজও উজ্জ্বল। আজও আমরা দেখতে পাই লাবণ্য হতে চাওয়া হাজার হাজার মুখ। প্রায় একশ বছর আগে ঠাকুর যে লাবণ্যকে এঁকেছেন তা সাহিত্যে শুধু নয় সমাজের আঙিনাতেও আজও দুর্লভ।

শেষের কবিতা উপন্যাসের কবিতাগুলো আজীবন প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে। রবীন্দ্রনাথ হৃদয় নিঙড়ে দিয়েছেন শেষের কবিতায়। প্রতিটা কবিতার প্রতিটা লাইন যেন এক একটা মাইলস্টোন। সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্নে বারবার একটি প্রশ্নের দেখা মেলে। ‘শেষের কবিতা’ কোন ধরনের রচনা? উত্তরে চারটি বিকল্পের মধ্যে দুটো থাকে কবিতা ও উপন্যাস। এই উপন্যাসে কবিতার বহু খণ্ডিতাংশ রয়েছে। কবিতার ছন্দে ও লয়ে সুরারোপিত হয়েছে কাহিনিতে। অমিতের আত্মবিশ্বাসী ঝঙ্কার, লাবণ্যের শান্ত স্থির স্রোত দুয়ে মিলে কাব্যকথনে মুখরিত হয়েছে প্রেমে। “দোহাই তোদের একটুকু চুপ কর। ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।” এক বিরামহীন ভালবাসার গান এ উপন্যাস। এখানে আরেকটি অদেখা চরিত্রের খোঁজ মেলে। অমিত যে কবির কবিতাকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে তিনি নিবারণ চক্রবর্তী। লাবণ্যের রবীন্দ্রপ্রেমের বিপরীতে সে একেই দাঁড় করিয়ে দিতে চায়। তাকে কেউ চেনে না, জানে না, গালি দেবারও উপযুক্ত মনে করে না। ক্ষণে ক্ষণে এও মনে হয়, অমিত নিজেই কি সেই নিবারণ চক্রবর্তী? সে কি গা ঢাকা দিয়ে আছে হালফ্যাশান প্রগলভ ব্যারিস্টার অমিত রয়ের মধ্যে? কিছু প্রশ্ন কেই যায়, সাথে বহু সম্ভাবনাও!-শেষের কবিতার শেষ নেই। শেষের কবিতা আসলে অবিরাম বেজে চলা রবীন্দ্র যুগের গান শোনায়। শেষের কবিতা প্রতিনিয়ত বলে রবীন্দ্রনাথ প্রাসঙ্গিক ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। মোর বন্যা, তুমি অনন্যা,/আপন স্বরূপে আপনি ধন্যা। অমিতলালের লাবণ্য সম্পর্কে এই উক্তি থেকেই ‘শেষের কবিতা’র নায়িকা লাবণ্যের পরিচয়ের প্রথম সূত্রটি পাওয়া যায়। আর পাঁচটি মেয়ের মধ্যে যে সে একজনা, তা সুস্পষ্ট। মাতৃহীন, অধ্যাপক পিতার আদুরে মেয়ে লাবণ্য ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনার সঙ্গে বড় হতে হতে তার জীবনে যেন পড়াশুনাই একমাত্র সঙ্গী হয়ে ওঠে। অনেক বই পড়ে সে, তার নিজস্ব একটা জগৎ আছে। তাতেই লাবণ্য অনন্য। দেখতেও কোথাও যেন একটা অন্যরকম ছাঁদ আছে তার। অমিতলালের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎতেই তা সুস্পষ্ট। লেখকের ভাষায়-
‘সদ্য-মৃত্যু-আশঙ্কার কালো পটখানা তার পিছনে, তারই উপরে সে যেন ফুটে উঠল একটি বিদ্যুৎরেখায় আঁকা সুস্পষ্ট ছবি- চারি দিকের সমস্ত হতে স্বতন্ত্র। মন্দরপর্বতের নাড়া খাওয়া ফেনিয়ে-ওঠা সমুদ্র থেকে এইমাত্র উঠে এলেন লক্ষ্মী, সমস্ত আন্দোলনের উপরে- মহাসাগরের বুক তখনো ফুলে ফুলে কেঁপে উঠছে।’ লাবণ্যের পরনে ছিল সাদা আলোয়ানের শাড়ি, তার উপরে একটি জ্যাকেট। তার দেহটি দীর্ঘ, বর্ণ হালকা শ্যামলা, টানাটানা চোখের ভেতর স্নিগ্ধতা, প্রশস্ত ললাটের পিছনে ঝুলে পড়া চুল, চিবুক ঘিরে সুকুমার মুখের ডৌলটি একটি অনতিপক্ব ফলের মতো রমণীয়। সবমিলিয়ে একেবারে নায়িকাদের মতো (আক্ষরিক অর্থে) অপূর্ব সুন্দর তা নয়, কিন্তু একটা অভূতপূর্ব জ্যোতিতে ভাস্বর লাবণ্য। অমিত যেন আচমকাতেই প্রেমে পড়ে যায় তার। 

উপন্যাসে ধীরে ধীরে লাবণ্যের স্বভাব, চরিত্র এবং বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটতে থাকে। শান্তশিষ্ট এই মেয়েটি জীবন নিয়ে বড় কোন আশা করতে পারে না। কোথায় যেন তার একটা শঙ্কা কাজ করে। অথচ আর পাঁচটা মেয়ের থেকে সে যে কোন কোন ক্ষেত্রে আলাদা, তা সেও বুঝতে পারে। অমিত যতই তার নিকটবর্তী হতে থাকে ততটাই তার শঙ্কা বাড়ে। অমিতের চকিতে এসে ভালোবাসার আহ্বানটা লাবণ্যের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। তাই অমিত যখন ফিরে আসতে পারবে না বলে জানায়, তখন লাবণ্য বিচলিত হয় না। বরং এমনটা অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই তার মনে হয়ে। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই উপন্যাসে লাবণ্য নামক চরিত্রটিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যাতে লাবণ্য একেবারেই অন্যরকম একটি মেয়ে। বাস্তবিক এমন মেয়ে আছে কিনা সন্দেহ। অন্যদিকে অমিতলালের মতো নায়কের অভাব নেই দুনিয়াতে। সে জন্য লাবণ্য চরিত্রটি ভিন্ন একটি মাত্রাতে পৌঁছেছে। 

লাবণ্য এমন একটি মেয়ে, যে তার হৃদয়ের গভীরের অনুভূতিকে একেবারে গোপনে লুকিয়ে রাখতে জানে। সে এতে এতটাই পারদর্শী যে উপন্যাসেও শেষ পর্যন্ত ব্যক্ত হয়নি লাবণ্যের অমিতের প্রতি ভালোবাসার সুনির্দিষ্ট রূপটি। তাই তার শেষ চিঠিতে লাবণ্য লিখেছে- ওগো তুমি নিরূপম,
হে ঐশ্বর্যবান,/তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-/গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।/হে বন্ধু, বিদায়। অমিতকেই শেষ পর্যন্ত একটি নায়কের চরিত্র দান করে লাবণ্য নিজেকে সামান্যা হিসেবে জানিয়েছে। উপন্যাসের কাহিনিভাগে কিন্তু অমিতের চেয়ে লাবণ্যই যথেষ্ট উজ্জ্বল। বরং অমিত যখন লাবণ্যকে শেষ চিঠি লেখে সেখানে তার সহজ স্বীকারোক্তি করে যে, লাবণ্য তার কাছে দিঘির মতো বিস্তৃত। যেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে সাঁতার কাটা যায়। অন্য পাঁচটি মেয়ে যেখানে ঘটির জলের মতো নিত্যনৈমিত্তিক কাজেই যাদের দরকার। আমাদের সমাজে লাবণ্যরা যত কাঁদে নিরবে, আর নিজেকে ঠকায় ভালবাসার মানুষের আঘাতে, ততই তারা প্রশংসা পায় বিখ্যাত হয় ; আসলে তারা জীবনে কতটুকু নিজেকে সস্তি পূর্ণ  সুখদিতে পারে? আর অমিতরা বড় বড় কথা বলে মহৎ যে নারীগুলোর মন ভাঙ্গে ভালবাসার স্টাইলে, তারা কত বার প্রেমে পরে? মানুষ এক মনে কত জনকে ভালবাসতে পারে? মনের ও তো চরিত্র আছে? মন যাকে ভালবাসে সেখানে মনের মিলই যথেষ্ট, সে কোন যোগ্যতার লেশ মাত্র নেই। চোখের রঙ্গে ভালবাসলে সেটা বদলায়, মনের রংএ ভালবাসলে তার পরিবর্তন হয় না। যারা ঠকায় তারাই একমাত্র ঠকে!
যারা ত্যাগ করতে জানে, দান তো ঈশ্বর তাদের দেয়!
ভালবাসা পাওয়া ভাগ্যবান তারাই যারা ঈশ্বরের দান পায়।
ভালবাসাহীন ঘর, তাসেরঘর! আর সজ্জা হয় কণ্টক সজ্জা।
ভালবাসি বলা বড় সহজ সমাচার, কিন্তু ভালবাসা যার তার কাজ নয়। ভালবাসা শেষ বলে কিছুই নেই! ভালবাসা অশেষ।

‘তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।’ 

( লেখক : প্রাবন্ধিক, গবেষক, এম এ বাংলা)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর